নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | 0 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ আদায়ে রূপালী ব্যাংক পিএলসি ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৫ সালে দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকটি শ্রেণিকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ থেকে মোট ২,৩৩৫ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে থাকা শ্রেণিকৃত ঋণ নিয়ন্ত্রণে রূপালী ব্যাংক দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ আগের বছরের তুলনায় ১,৭১৬ কোটি টাকা কমে ১৯,৬৪১ কোটি টাকায় নেমেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার ফল।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই এই সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খেলাপি ঋণ আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ফলস্বরূপ ২০২৫ সালে ব্যাংক ১,৩০০ কোটি টাকা নগদ আদায় করতে সক্ষম হয়, যা রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
একই বছরে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা হয় ৩৬১ কোটি টাকা, আর সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায় করা হয় আরও ১,৯৭৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট আদায় দাঁড়ায় ২,৩৩৫ কোটি টাকা, যা রূপালী ব্যাংকের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মামলা ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হয়। প্রধান কার্যালয় থেকে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৮২৩টি মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫৭১। দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হয় চিফ লিগ্যাল অ্যাডভাইজার।
শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ও হারেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ২১,৩৫৭ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণ থাকলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা কমে ১৯,৬৪১ কোটি টাকায়, আর শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪২% থেকে নেমে ৩৮% হয়েছে। প্রভিশন ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী ও এসএমই খাতে ঋণ সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে এসএমই খাতে নতুন ঋণ বিতরণ হয়েছে ১,৪৭০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে রূপালী ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো ‘রূপালী ক্যাশ’ মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজ ও নিরাপদ লেনদেন সুবিধা পাচ্ছেন। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য চিফ ইনফরমেশন টেকনোলজি অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে ব্যাংকের নতুন আমানত সংগ্রহ ও গ্রাহকসেবাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুনভাবে খোলা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৪৯ হাজার, আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বেশি। একই সময়ে ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা সুদবিহীন ও স্বল্প সুদের।
১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৫ সালে ৬,৫০০ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ এবং ৪ লাখ নতুন হিসাব খোলা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
রেমিট্যান্স আহরণেও সাফল্য দেখিয়েছে ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
২০২৫ সালে রূপালী ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৭০০ কোটি টাকায়, ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেট রেশিও দাঁড়িয়েছে ৩.০৪%, আর প্রভিশন ঘাটতি কমেছে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ডেবিট কার্ড ইস্যু করেছে।
রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কেবল তাৎক্ষণিক সাফল্য নয়, বরং ব্যাংককে টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নই আমাদের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।”
তিনি আরও জানান, বছর শেষে দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর কর্মকৌশলের কারণে শ্রেণিকৃত ঋণ ৩৮% ও ১৯,৬৪১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে রূপালী ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের একটি শক্তিশালী ও উদাহরণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
Posted ৮:২৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
sharebazar24 | sbazaradmin
.
.